বিশেষ প্রতিনিধি: শুধু গানের সুর শেখা নয়, একজন সঙ্গীত শিল্পীকে সঙ্গীত চর্চার মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করতে হয়। রুচিশীল সঙ্গীত পরিবেশনার জন্য একজন শিল্পীর অধ্যবসায় ও অনুশীলনই হচ্ছে শিল্পী হিসেবে বড় হওয়ার প্রথম শর্ত। আর সকল গুণে গুণান্বিত য়ে অজস্র দর্শক-শ্রোতার মন জয় করে, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থেকে সঙ্গীতকে ভালোবেসে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যিনি আজ সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সর্বমহলে শ্রদ্ধাভাজন তিনি অজিত রায়। গুণী ব্যক্তিত্ব অর্জিত রায় এর পিতা স্বর্গীয় মুকুন্দ চন্দ্র রায় এবং মাতা কনিকা রায়।

১৯৩৮ সালের ২৯ জুন রংপুর, সোনালুরকুটি কুড়িগ্রামের একটি সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে অজিত রায়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ঘটনা থেকে কিশোর মনে দাগ কাটে। মায়ের কাছেই হাতেখড়ি নেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার মায়েরও পরিচিতি আছে। কিশোরবেলা থেকেই তবলা বাজান, নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সুর ও স্বরের সাধনা শুরু করেন। ১৯৫৭ সাল মাধ্যমেক পরীক্ষায় পাস করে কারামইকেল কলেজে ভর্তি হন। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সঙ্গীত বিভাগ থেকে তিনটি বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তখন থেকে নিজেকে একজন যোগ্য সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ অনুপ্রেরণার উদ্বুদ্ধ হন। কলেজের বার্ষিকী অনুষ্ঠান উদযাপন উপলক্ষে চঞ্চালিকা গীতনাট্যের ‘আনন্দ’র ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তাই তখন থেকেই রবীন্দ্র সঙ্গীত সাধনার প্রতি তিনি মনোযোগী হন।

আনুমানিক ১৯৬২ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে সঙ্গীতের নেশায় এবং জীবন প্রতিষ্ঠায় তিনি ঢাকায় আসেন। আর তখন থেকেই নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সঙ্গীতানুষ্ঠানে কণ্ঠ সঙ্গীত পরিবেশন করতে থাকেন। এরপর ১৯৬৩ সালে রেডিওতে অডিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রোগ্রাম করতে থাকেন এবং টেলিভিমনের জন্মের পর থেকেই অদ্যাবধি একটার পর একটা অনুষ্ঠান করে চলেছেন এই দরদী শিল্পী। শুধু রেডিও বা টেলিভিশনে নয়, মাঠে, ময়দানে খোলা মঞ্চে, গ্রামে-গঞ্জে, প্রগতিশীল ভূমিকায় আজও সংস্কৃতির চর্চা করে চলেছেন। দেশ মাতৃকার টানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার সুখকে সঙ্গী করে সঙ্গীত প্রযোজকের দায়িত্ব নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বেতারে চাকরিতে যোগ দেন। স্ত্রী বুলা রায়। ১৯৭৩ এ ফেব্রুয়ারিতে এই শিল্পীর বিয়ে হয়। এক ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত পিতা তিনি। দুই ভাইয়ের মধ্যে শিল্পী অজিত রায় বড়।

চাকরির ক্ষেত্রে অবসর হলেও জীবন যে থেমে না তার প্রমাণ অর্জিত রায় নিজেই। সঙ্গীতের চত্বরে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে তিনি আজও সঙ্গীত সাধনায় নিয়োজিত রেখেছেন। প্রাণের টানেই তিনি গান করেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত তাকে সুন্দরের পথে চলতে শিখিয়েছে। তার জীবনের যা কিছু অর্জন তা হলো এ দেশের মানুষের উৎসাহ, প্রেরণা, ভালোবাসা ও আশীর্বাদ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্ম তিথিতে বিশ্ব ভারতীয় শান্তি নিকেতনের আমন্ত্রণে দুইদিনব্যাপী একক দুটি অনুষ্ঠানে কণ্ঠ সঙ্গীতে অংশগ্রহণ এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে সারা ভারত সফর, ১৯৭৪ সালে সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন এই গুণী ব্যক্তি। তিনি সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, নান্দনিক গোষ্ঠী (খুলনা), রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা (চট্টগ্রাম) ১৯৯৯, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলন ২০০৩ পদক, সংবর্ধনা, আমরা সূর্যমুখী (১৯৮৫), মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত শব্দ সৈনিক পদক, জীয়ন কাঠি একাডেমী আয়োজিত গুণীজন পদক সংবর্ধনা (১৯৯৪ সাল), চট্টল ইয়ুথ করার আয়োজিত দেবু ভট্টাচার্য ও এস.এম সুলতান পদক (১৯৯৪), সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির সংবর্ধনা পদক (১৯৯৪), রংপুর সাংস্কৃতিক ফোরাম প্রদত্ত বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৪), রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, ঢাকা, গুণীজন সংবর্ধনা ও পদক (১৯৯৬), কারমাইকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতির কর্র্তক সংবর্ধনা ও পদক (১৯৯৭), কালান্তর গোষ্ঠী পদক ও সংবর্ধনা (১৯৯৪), অভ্যুদয় পদক ও সংবর্ধনা (২০০০), রংপুর নাগরিক কমিটি পদক ও সংবর্ধনা (২০০০), আজকের কাগজ পরিবার সংবর্ধনা, কথা ললিতকলা একাডেমী পদক সংবর্ধনা, জার্মান রেডিও কোম্পানি পদক সংবর্ধনা, গ্রামীণফোন আয়োজিত স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার-এরর বীর শব্দ সৈনিক অনুষ্ঠান পদক পেয়েছেন।

সঙ্গীতশিল্পী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অজিত রায় ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ৪ সেপ্টেম্বর ২০১১সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।