নিজস্ব প্রতিনিধি:

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া- মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।

আর কি হে হবে দেখা?- যত দিন যাবে,
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
বারি-রুপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে
বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
লইছে যে নাম তব বঙ্গের সংগীতে।

কপোতাক্ষ নদ  কবিতার এই বিখ্যাত অমর কবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু আছে তাঁর অমর কাব্য ও গ্রন্থ লেখা। যা পৃথিবীর ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।

আজ (২৫ জানুয়রি) সোমবার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৭তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আজ বিকেলে যশোর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাগরদাঁড়ির মধুমঞ্চে কবির জীবনীর ওপর আলোচনাসভা, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এবার কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সাগরদাঁড়িতে মধুমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তবে  মধুমেলা না হলেও জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এলাকার মানুষ সাগরদাঁড়িতে উপস্থিত হবেন কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মধুসূদন দত্ত। তাঁর বাবা জমিদার রাজনারায়ণ দত্ত আর মা জাহ্নবী দেবী। মধুসূদন দত্ত ছোটবেলায় কলকাতা যান। খিদিরপুর স্কুলে দুই বছর পড়ার পর ১৮৩৩ সালে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। বাংলা, ফরাসি ও সংস্কৃত ভাষায়ও শিক্ষা লাভ করেন।

১৮৪৪ সাল থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার বিশপ’স কলেজে অধ্যায়ন করেন মধুসূদন। সেখানে তিনি গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখেন। তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা মাদ্রাজ স্পেক্টেটর’র সহকারী সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৬২ সালের ৯ জুন ব্যারিস্টারি পড়তে যান তিনি বিলেতে। ১৮৬৬ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যেও অসামান্য অবদান রাখায় বিশ্ববাসী এই ধীমান কবিকে মনে রেখেছে কৃতজ্ঞচিত্তে। যদিও তাঁর প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’কে ইংরেজরা তখন সাদরে গ্রহণ করেনি। পাশ্চত্যের প্রতি আর্কষিত মধুসূদন ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘মাইকেল’ উপাধি ধারণ করেন।

ইংরেজি সাহিত্যে মধুসূদনের কীর্তির যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় মনক্ষুন্ন হয়ে পড়েন তিনি। তখনই বুঝতে পারেন শেকড় ভোলার জ্বালা। ইংরেজি সাহিত্য থেকে ছিটকে পড়ে বন্ধুদের পরামর্শে মধুসূদন বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে উপহার দেন শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য, কৃষ্ণকুমারী, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজঙ্গনা কাব্য, বীরঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশদপদী কবিতাবলী, হেক্টরবধ-এর মতো বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম।

মধুসূদন দত্ত নাট্যকার হিসেবেই প্রথম বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করেন। ১৮৫৯ সালে তিনি রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক। ১৮৬০ সালে রচনা করেন দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ এবং পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘পদ্মাবতী’।

পদ্মাবতী নাটকেই মাইকেল প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। একের পর এক রচনা করেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’  (১৮৬১) নামে মহাকাব্য, ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য (১৮৬১), ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক (১৮৬১), ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতা (১৮৬৬)।

মধুসূদনের শেষজীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। আইন ব্যবসায় তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেননি। তা ছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহাকবি মাইকেল।

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম এম আরাফাত হোসেন বলেন, সামাজিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে আজ সোমবার বিকেল থেকে মধুকবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে। করোনার কারণে এ বছর মধুমেলা হবে না।