তিমির চক্রবর্ত্তী: গত ৪ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হক। তাঁর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এই আসনে এখনো উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়নি।

তবে এই আসনে এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে উপ-নির্বাচনের ডামাডোল। নির্বাচনের জন্য একাধিক আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে নেমেছেন জনগণের মন জয় করার জন্য। রমজান মাস উপলক্ষে তারা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন ইফতার পার্টির আয়োজন করে ভোটারদের কাছে টানতে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, সাবেক এমপি আসলামুল হক জীবিত থাকাকালীন তার একক আধিপত্যে জাতীয় নির্বাচন করার জন্য এখানে কোন নেতা তৈরী হয়নি আর সেটা তিনি ইচ্ছে করেই তৈরী করেননি।
এলাকাসূত্রে জানাগেছে, এমপি আসলামুল হক ছিলেন ভুমিদস্যু, টেন্ডারবাজী আর বালুমহল দখল করে বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছিলেন। তার কথা ছাড়া এখানে কেউ টু শব্দও করতেন না। তাঁর ভয়ে তটস্থ থাকতো তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে এলাকাবাসী। আর একারণেই বিকল্প কোন নেতা তৈরী হয়নি।
অপরদিকে এই আসনে এখন যারা নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী তাঁরা প্রায় অধিকাংশই এই নির্বাচনী এলাকার বাহিরে অথাৎ বিগত নির্বাচনে আশপাশের আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে বিগত নির্বাচনে যাঁরা মনোনয়নের জোরালো দাবিদার ছিলেন তাঁরাই এবারেও নৌকার কাণ্ডারি হতে চান। ফলে আসনটিতে আসলামুল হকের হঠাৎ মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হতে কেন্দ্রীয় লোভিং-তদবিরে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যই।

নির্বাচনে আগ্রহীদের মধ্যে রয়েছেন- আসলামুল হকের স্ত্রী মাকসুদা হক, সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও যুব মহিলা লীগের নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি ও সাংগঠনিক সম্পাদক এ বি এম মাজহারুল আনাম, বৃহত্তর মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা দেলোয়ার হোসেন, দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা কাজী ফরিদুল হক হ্যাপী, চলচ্চিত্র জগতের খল-অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজলসহ অন্তত এক ডজন নেতার প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের দুই সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী দুই নেতা আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবাশ্বের চৌধুরীও প্রার্থী হতে আগ্রহী।
মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরে রাজনীতি করছি। অনেক মানুষ অনুরোধ করছে প্রার্থী হতে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নেত্রী চাইলে আমি প্রার্থী হব। নেত্রী যাঁকে মনোনয়ন দেবেন তাঁর পাশে থেকেই কাজ করব। তবে তিনি ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে আসলামুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আসনের এলাকাগুলোতে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। ফলে সর্বশেষ দুই জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিল একেবারেই কম। আসনটিতে আসলামের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন। আসলামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি মাঠে ছিলেন। আসলামুল হকের বিরুদ্ধে জমি দখল, অর্থনৈতিক নানা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় গত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন তুহিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসলামুল হককেই বেছে নেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। তবে মনোনয়ন বঞ্চিত হলেও হাল ছাড়েননি তুহিন। এলাকায় থেকে নিজের অনুসারী নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ত্রাণ বিতরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকাসূত্র জানায়, ঢাকা-১৪ আসনে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী মাঠে থাকায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তুহিন। অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করছেন। তবে আওয়ামী লীগের মতো বড় দলে যাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁর পেছনেই অন্য নেতাকর্মীরা কাজ করেন। ফলে সব সময় মাঠে থাকলেই মনোনয়ন পাওয়া যায় না। অনেক সময় বাইরে থেকেও প্রার্থী করা হয়।

এ প্রসঙ্গে তুহিন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বিগত দুই জাতীয় নির্বাচনে আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জোরালো দাবিদার ছিলাম। তখন মনোনয়ন না পেলেও এখানকার মানুষের পাশে থেকে সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি। যেকোনো বিপদে, প্রয়োজনে এলাকার মানুষ আমাকে পাশে পায়। সে জন্য তারাও আমার পাশে আছে। এটাই আমার শক্তি। এছাড়া আমি অনেকের মতো এমপি হয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হইনি। আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। দল চাইলে এই আসনে নৌকার প্রার্থী হব।অন্য যাঁরা প্রার্থী হতে চাইছেন তাঁরা কেউই আগে এই এলাকার মানুষের পাশে ছিলেন না।

এলাকাসূত্র আরো জানায়, কাজী ফরিদুল হক হ্যাপী সাবেক এমপি আসলামুল হকের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিত। বিগত নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এবারও মনোনয়ন পেতে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই মিরপুরের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। মিরপুর বাংলা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও দারুস সালাম থানা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা মহানগর উত্তরেরও সাবেক নেতা হ্যাপী। করোনা মহামারির মধ্যেও এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দিয়ে প্রশংসিত হন।
তিনি বলেন, গত নির্বাচনে আমি মনোনয়ন চেয়েছিলাম। এবারও চাইব। নতুন অনেকেই এ আসনে প্রার্থী হতে চাইছেন। আমরা আমাদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। উনার কাছে আমাদের দাবি হলো এই এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে এমন প্রার্থীকে যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়।

অপরদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি বিগত নির্বাচনগুলোতে ঢাকা-১৬ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু তিনি এবার ঢাকা-১৪-এর উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী।