বিশেষ প্রতিনিধি: ঢাকাবাসীর জন্য কয়েক বছর আগেও মেট্রোরেল ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নকে শেখ হাসিনার সরকার বাস্তবে পরিণত করে চলতি বছরেরর স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করা হবে। মেট্রোরেলের কম্পিউটার মডেলের একটি ভিডিও টিভিতে বা অনলাইনে দেখানো হয়েছিল। সেই ভিডিও দেখে রাজধানীবাসী নতুন এক ধরনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ‘আসিতেছে দেশের প্রথম মেট্রোরেল’ যা আপনাকে সময়মতো সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর রাস্তায় যানজটে বসে বিরক্তিকর অপেক্ষা নয়। মেট্রোরেলে চড়ে নিমেষেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবেন। সামগ্রিকভাবে এমআরটি ব্যবস্থা ট্রাফিক যানজট কমিয়ে ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করে তুলবে এবং শহরটিকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তর করবে।

পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নাধীন র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইনের মধ্যে এমআরটি লাইন ৬-এর দুর্দান্ত অগ্রগতি হয়েছে। করোনা মহামারিতে কাজ কিছুটা থেমে থাকলেও এখন আবার পুরোদমে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। করোনার এই দীর্ঘ ৯ মাসে সরকারের অগ্রাধিকার এই প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ১১.৭ শতাংশ। এতে পূর্ব নির্ধারিত সময়ে মেট্রো চলাচল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর যানজট কমাতে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত উড়ালপথে ২০.১০ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে। দুই ভাগে ভাগ করে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির প্রথম অংশ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭৮.৩৮ শতাংশ। আর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের হয়েছে ৪৯.৪৭ শতাংশ। ইলেক্ট্রনিক ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি হয়েছে ৩৪.৮২ শতাংশ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের সার্বিক গড় অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।

এখন চলছে স্টেশন নির্মানের কাজ।আগারগাঁও, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় চলছে স্টেশন নির্মাণ, বিদ্যুৎ-সংযোগসহ অন্যান্য কর্মযজ্ঞ। তবে উত্তরের অংশের তুলনায় দক্ষিণা পাশে কাজের গতি অনেকটা কম বলে মনে করা হচ্ছে। কাওরান বাজার সার্ক ফোয়ারা থেকে বাংলামটরের দকে ভায়াডাক্ট নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেল নির্মাণ কাজের প্যাকেজগুলোর মধ্যে ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন (প্যাকেজ-১) শতভাগ শেষ হয়েছে। ডিপো এলাকার পূর্ত কাজের (প্যাকেজ-২) অগ্রগতি হয়েছে ৭৭ শতাংশ। আর প্যাকেজ-৩ ও ৪ (উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ) এর কাজ ২০১৭ সালের ১ আগস্ট শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিসেবা স্থানান্তর, চেকবোরিং, টেস্ট পাইল, মূল পাইল, পাইল ক্যাপ, আই-গার্ডার, প্রিকাস্ট সেগমেন্ট কাস্টিং ও পিয়ার হেড নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ১১.৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্টের মধ্যে ১১.৩০ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। ৯টি স্টেশনের সব-স্ট্রাকচার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনের কংকোর্স ছাদ নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে।
বর্তমানে পল্লবী, মিরপুর ১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া এবং শেওড়াপাড়া স্টেশনের কংকোর্স ছাদ নির্মাণের কাজ চলছে। উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনের প্লাটফর্ম নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। উত্তরা উত্তর স্টেশনের প্লাটফরম নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। পল্লবী, মিরপুর ১১ এবং কাজীপাড়া স্টেশনে সমাপ্তকৃত (আংশিক) কংকোর্সের ওপর প্লাটফর্ম নির্মাণ শুরু হয়েছে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনে স্ট্রিল স্ট্রাকচার ইরেকশনের কাজ চলছে।
উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনে মেকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং এর কাজ শুরু হয়েছে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশন কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৭ কে হস্তান্তরের জন্য বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, সিগনালিং ও টেলিকমিউনিকেশন এবং স্টেশন কন্ট্রোলার কক্ষ নির্মাণ কাজ চলছে। মেট্রোরেল নির্মাণে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় তা বিবেচনায় ৫টি লং স্প্যান ব্যাল্যান্স ক্যান্টিলেভের এর মধ্যে ৪টি সমাপ্ত হয়েছে। বাকি ১টির নির্মাণ কাজ চলমান। এরইমধ্যে ৭.৮৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট রেললাইন ও ওভারহেড ক্যাটেনারিজ সিস্টেম (ওসিএস) মাস্ট স্থাপনের জন্য কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৭ এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এ প্যাকেজের সার্বিক অগ্রগতি ৭৫.৮৫ শতাংশ
অপরদিকে আগারগাঁও থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত ৩.১৯৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৩টি স্টেশন নির্মাণ (প্যাকেজ-৫) কাজ বাস্তবায়ন কাজ ২০১৮ সালের ১ আগস্ট শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে এ অংশে পরিসেবা স্থানান্তর, চেকবোরিং, ট্রায়াল ট্রেঞ্চ, টেস্ট পাইল, স্থায়ী বোরড পাইল, পিয়ার কলাম ও পিয়ার হেড সম্পন্ন হয়েছে। মোট ২০৩টি পাইল ক্যাপের মধ্যে মেইন লাইনের সকল পাইল ক্যাপ (১০৬টি) এবং স্টেশনের ৯৭টি পাইল ক্যাপের মধ্যে ৪৪টিসহ মোট ১৫০টি পাইল ক্যাপ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিজয় সরণি, ফার্মগেট ও কাওরান বাজার স্টেশনের সাব স্ট্রাকচার নির্মাণ কাজ অব্যাহত রয়েছে। মোট ১১৫টি স্টেশন কলামের মধ্যে ৩২টি স্টেশন কলাম সম্পন্ন হয়েছে। ৬টি পোর্টাল বিমের মধ্যে ৩টি পোর্টাল বিম নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ২টি স্পেশাল লড স্প্যানের মধ্যে ১টির কাজ অব্যাহত আছে। এক হাজার ৪৮টি প্রিকাস্ট সেগমেন্টের মধ্যে ৩৬৩টি সেগমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে এবং ৩ হাজার ২৩৪টি প্যারাপেট ওয়ালের মধ্যে ৯৬টি প্যারাপেট ওয়াল সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা ডিপো এলাকায় নির্মাণাধীন মেট্রোরেল এক্সিবিশন ও তথ্য সেন্টারের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। ৩.১৯৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্টের মধ্যে ২৪০ মিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। এ প্যাকেজের সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি ৫৪.১৪ শতাংশ।
কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৪.৯২২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৪টি স্টেশন নির্মাণকাজ (প্যাকেজ-৬) অংশে পরিসেবা স্থানান্তর, চেকবোরিং, ট্রায়াল ট্রেঞ্চ, টেস্ট পাইল ও স্থায়ী বোরড পাইল সম্পন্ন হয়েছে। ১৬০টি পিয়ার কলামের মধ্যে ১৩৯টি পিয়ার কলাম সম্পন্ন হয়েছে। মোট ২৯৮টি পাইল ক্যাপের মধ্যে ১৭২টি পাইল ক্যাপ সম্পন্ন হয়েছে। ১৩৬টি পিয়ার হেডের মধ্যে ১১৭টি পিয়ার হেড সম্পন্ন হয়েছে এবং এক হাজার ৬২০টি সেগমেন্টের মধ্যে ৮৪৪টি সেগমেন্ট কাস্টিং সম্পন্ন হয়েছে। মোট ৪ হাজার ৯৪৬টি প্যারাপেট ওয়ালের মধ্যে ১৪৬টি প্যারাপেট ওয়াল সম্পন্ন হয়েছে। মোট ৯টি পোর্টাল বিমের মধ্যে ১টি নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মতিঝিল স্টেশনের সাব স্ট্রাকচার নির্মাণ কাজ অব্যাহত রয়েছে। ৪.৯২২ কিলোমিটার ভায়াডাক্টের মধ্যে ২৪০ মিটার ভায়াডাক্ট দৃশ্যমান হয়েছে। বাস্তব অগ্রগতি ৫৫.০৮ শতাংশ।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ি, স্বাধীনতা উদযাপনের সুবর্ণজয়ন্তীর অংশ হিসাবে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে। করোনা মানুষের জীবনের মতো মেট্রোরেলের কিছু ওলটপালট করে দিলেও আশার কথা যে, মেট্রোরেলের বগি এ বছরের এপ্রিলে দেশে আসবে। তবে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়বে। ২০৩০ সালে ৪৮ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের শহরে বাস করবে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মেট্রোরেলের দ্রুত ও ভালো অভিগম্যতার জন্য যাত্রীবান্ধব স্টেশনগুলি বহুতল পার্কিং বিল্ডিং হওয়া দরকার।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্যভাবে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। সীমিত পার্কিংয়ের অবস্থান কোথায় সেটাও অজানা। সে কারণে ঢাকার অনেক রাস্তায় পার্কিং করার প্রবণতা লক্ষণীয়। মেট্রোরেল যেহেতু বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করবে, সেহেতু মেট্রোলাইন ধরে বেশ কয়েকটি মাল্টি-স্টোরি গাড়ি পার্ক নির্মাণ প্রয়োজন। পার্কিং থাকলে ট্রেনের যাত্রীদের গাড়ি চালানোর পরিবর্তে ট্রেনে যেতে উত্সাহিত করবে, এভাবে রাস্তাগুলিতে চাপ কমবে।

সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে কেবল গাড়ি পার্কিং নয়, সাইকেলগুলি সহজেই স্বল্প দূরত্বে পৌঁছানোর পক্ষে সবচেয়ে সুবিধাজনক। সাইকেল রাইডাররা একবার মেট্রোরেল স্টেশনে উঠলে তাদের স্টেশনে ছেড়ে যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত। ঢাকা এমআরটি কর্তৃপক্ষ নিরাপদে সাইকেল পার্কিংয়ের সুবিধা রাখলে বাইসাইকেল স্টেশনে রেখে ট্রেন ধরতে সহজ হবে। এতে করে ট্রানজিট স্টেশন হিসাবে মেট্রোরেলের ক্যাচমেন্ট অঞ্চলটি আরও প্রসার হতে পারে

জনবহুল ঢাকা শহরে প্রচুর পথচারী ফুটপাত ব্যবহার করেন। তবে ফুটপাতগুলি পথচারীবান্ধব নয়। পথচারীরা রাস্তা পারাপারের সময় কখনো কখনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন। সে কারণে স্কাইওয়াক ব্যবস্থা সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করতে পারে। স্কাইওয়ে নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস ট্রাফিক এবং আবহাওয়ার প্রভাব ছাড়াই লিঙ্কওয়ে করা হলে পথচারীরা নিরাপদে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন।

ব্যস্ত ঢাকা নগরীতে পথচারীদের সড়কপথ থেকে পৃথক করতে পরিবেশবান্ধব ওভারহেড স্কাইওয়াক তৈরি করা উচিত। উদাহরণ হিসাবে বিমানবন্দর, ফার্মগেট বা বড় শপিংমলকে সংযোগ করে স্কাইওয়াকটি তৈরি হলে বাংলাদেশ নতুন স্মার্ট সিটির জন্য একটি পরিচয় বহন করবে। তাছাড়া উত্তরায় মেট্রোরেল আর স্টেশনে পৌঁছানোর জন্য উপযুক্ত রাস্তা নেই, যা আছে তাও অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। ভাঙাচোরা রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে রাজউকের উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দাদের প্রতিনিয়তই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাঁরা ইচ্ছা করলেও উত্তরা খাল পার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারেন না। মেট্রোরেলের স্টেশনে সময়মতো পৌঁছে যাওয়ার জন্য রাস্তা সংস্কার খুব দরকার।

অবশেষে, ঢাকা গণ র‌্যাপিড ট্রানজিট কর্তৃপক্ষকে মেট্রোরেল নির্মাণের পাশাপাশি উল্লেখিত অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের ব্যাপারে অনুরোধ জানাই।