শামসুন নাহার স্মৃতি নামের এই গ্রাম্য বালিকার পিতা রহস্যজনকভাবে খুন হন, মা মারা যান আগুনে পুড়ে, আর শৈশবে তিন বছর বয়স থেকে পিতৃমাতৃহারা তিনি মানুষ হন পিতামহের কাছে। দারিদ্র্যের কারণে মনরোর মতোই কিশোরীকালে বিয়ে করতে বাধ্য হন একজনকে। অপরিণত বয়সের সেই বিয়ে দুজনের কারোরই টেকে না। তারপর তারা দুজনেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দেন নিজেদের। তারপর একদিন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, নানা স্ট্রাগলের পর এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটে তাদের জীবনে। সেই উত্থান-কাহিনি খুব একটা সহজ-সরল, সাদা ছিল না, তার অনেকটাই অন্ধকার আর ক্লেদে ভরা। কিন্তু তা অবিশ্বাস্য, রূপকথার মতোই।

প্রিয় নরম্যান, প্রথমেই শনিবারের নিমন্ত্রণের জন্য তোমাকে ও হেদ্দাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তোমার স্ত্রীকে দারুণ ভালো লেগেছে আমার, কী ভীষণ উষ্ণ ব্যবহার ওর! আর ধন্যবাদ তোমার কবিতার বইটির জন্যও, যার সাথে আমার রোববারের গোটা সকালটা বিছানায় শুয়ে কেটেছে। তোমার সংস অফ প্যাট্রিসিয়া পড়ে মনে হয়েছে, আমারও তোমার মতো একটা মেয়ে থাকলে মন্দ হতো না!…জানো কি, আমিও মাঝে মাঝে কবিতা লিখতাম, বিশেষ করে যখন মন খারাপ থাকত খুব। আর কেউ কেউ বলে (অন্তত দুই জন) কবিতাগুলো তাদেরও খুব মন খারাপ করে দিয়েছিল, এমনকি কাঁদিয়েছে পর্যন্ত একজনকে। যাকগে, ধন্যবাদ জানাতেই এ চিঠি লেখা, হেদ্দা আর প্যাট্রিসিয়াকে শুভেচ্ছা জানিও।

এই হলো দুনিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত, সবচেয়ে নিন্দিত, সেক্স সিম্বল হিসেবে পরিচিত নায়িকা ‘ব্যাড গার্ল’ মেরিলিন মনরোর বন্ধুকে লেখা একটা সহজ, নির্দোষ ও বন্ধুত্বের সারল্যমাখা চিঠি। যে নারী নাকি দুনিয়ার তাবত পুরুষের ‘মাথা খেয়েছেন’, যার নজর থেকে নাকি বড় বড় ধনকুবের, কবি, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, চিত্র পরিচালক থেকে শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত কারও ‘রক্ষা’ নেই, অ্যালকোহল-ঘুমের ওষুধ আর পুরুষ- এই তিন যার নিত্যসঙ্গী– এই চিঠিতে জানা যায়, সেই মেয়েটি নাকি আবার নিভৃতে কবিতাও লিখত!

১৯৫৬ সালে মেরিলিন মনরো ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন কবি ও চিত্রনাট্যকার আর্থার মিলারকে, (মিলার তার তৃতীয় স্বামী আর এ বিয়েও বেশিদিন টেকেনি)। মিলারের বন্ধু ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম মার্কিন কবি নরম্যান রোস্টেন, যার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে এক নিখাঁদ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল মনরোর। মৃত্যুর দিনও টেলিফোনে দীর্ঘ এক আলাপচারিতা হয়েছিল তাদের মধ্যে।

আর ১৯৬২ সালের আগস্টের সেই রাতে নরম্যানই প্রথম মেরিলিন মনরোর বাড়ির পরিচারিকার কাছ থেকে অন্তিম ফোনটি পেয়েছিলেন, ছুটে গিয়েছিলেন লস অ্যাঞ্জেলসে তার অ্যাপার্টমেন্টে সেই গভীর রাতে, কিন্তু ততক্ষণে তার প্রিয় বন্ধুটি আর নেই। মেরিলিনকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে নরম্যান রোস্টেন লিখেছেন তার বেস্ট সেলার বই মেরিলিন: অ্যান আনটোল্ড স্টোরি; নিউইয়র্ক সিটি অপেরার জন্য লিখেছেন নাটক মেরিলিন; লিখেছেন আরও অনেক স্মৃতিকথা আর কবিতা; আর আমরা জেনেছি অন্য এক মেরিলিন মনরো ওরফে নরমা জিনসকে।

এই আগস্টে যখন মার্কিন মুলুকে মেরিলিন মনরোর মৃত্যুর ৫৯ বছর পূর্তি সশ্রদ্ধে পালন করছে তার ভক্তরা, তখন মেরিলিন মনরো আর নরম্যান রোস্টেনের সঙ্গে আমাদেরও যে একটা ক্ষীণ যোগাযোগ আছে, তা নিয়ে লিখতে বসে সবিস্ময়ে দেখি এই অদ্ভুত আগস্ট মাসে এই দারিদ্র্যে-লকডাউন-অতিমারিতে বিপর্যস্ত ছোট দেশটিতেও আরেক ‘ব্যাড গার্ল’কে নিয়ে ঘটে চলেছে তুলকালাম কাণ্ড, আর সেই ‘মন্দ মেয়েটি’কে দেখে কেন যেন বার বার মেরিলিন মনরোর কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে আমার।

ইতিহাস তাহলে একই পথে চলে, ঘুরে ফিরে আসে, সময় বদলায়, কিন্তু মানুষ বদলায় না। একদিন হলিউডের সবচেয়ে ‘খারাপ মেয়ে’র তকমা জুটেছিল যার কপালে, সেই মেরিলিন মনরোর চারপাশে মৌমাছির মতো উড়ে বেড়ানো লোভী পুরুষদের সবাই ভুলে গেছে, কিন্তু তিনি নিজে এতদিন পরও হৃদয়ে আসন পেতে আছেন কত মানুষের, পেয়েছেন গোল্ডেন গ্লোবের ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেভারিটের তকমা, তার চলচ্চিত্র ২৩০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে। যা হলিউডের ইতিহাসে এখনও এক বিস্ময়।

পিট সিগার্স তাকে নিয়ে বেঁধেছেন বিখ্যাত গান ‘হু কিলড নরমা জিনস, হোয়াই শি হ্যাড টু ডাই’, তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে এক ডজনের বেশি বই, যার সবই বেস্টসেলার। ইতিহাসবিদরা এখন বলেন, মার্কিন পপ কালচারের সূচনা এই মেয়েটির হাত ধরেই হয়েছে, আর প্রিয় বন্ধুকে লেখা তার সেই চিঠি নিলামে বিক্রি হয়েছে ৫০ হাজার ডলার দামে এত বছর পরও।

সেই একই দৃশ্যপট কি আবার রচিত হতে চলেছে এই দেশে? কী আশ্চর্য, যেন একই অপেরা চিরকাল অভিনীত হয়ে আসছে এত দিন ধরে নাট্যমঞ্চে, চারপাশে সেই একই ক্যামেরা, একই অনুসন্ধিৎসু চোখ, সেই একই ঘৃণা, আর সেই একই ‘ব্যাড গার্ল’-এর কেচ্ছাকাহিনি।

আমাদের ‘ব্যাড গার্ল’ পরীমনির মতো মেরিলিন মনরোও ছিলেন অনাথ শিশু, তখন তার নাম নরমা জিনস, যার পিতার কোনো পরিচয় নেই, মা উন্মাদ হয়ে মেন্টাল অ্যাসাইলামে আশ্রিত। এতিমখানায় বড় হওয়া নরমাকে সাত বছর বয়সে দত্তক নেন গ্রেস গোদার্দ নামের এক পারিবারিক বন্ধু, কিন্তু বিধিবাম, গ্রেসের স্বামীর এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

১৬ বছরের পালিত কন্যাকে সঙ্গে নেয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না তাদের। নরমার সামনে দুটি পথ খোলা : এতিমখানায় ফিরে যাওয়া, নয় বিয়ে।

আমাদের পরীমনির অতীতটাও মোটামুটি তাই। পত্রিকা-মারফত জানা, শামসুন নাহার স্মৃতি নামের এই গ্রাম্য বালিকার পিতা রহস্যজনকভাবে খুন হন, মা মারা যান আগুনে পুড়ে, আর শৈশবে তিন বছর বয়স থেকে পিতৃমাতৃহারা তিনি মানুষ হন পিতামহের কাছে।

দারিদ্র্যের কারণে মনরোর মতোই কিশোরীকালে বিয়ে করতে বাধ্য হন একজনকে। অপরিণত বয়সের সেই বিয়ে দুজনের কারোরই টেকে না। তারপর তারা দুজনেই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দেন নিজেদের। তারপর একদিন নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, নানা স্ট্রাগলের পর এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটে তাদের জীবনে। সেই উত্থান-কাহিনি খুব একটা সহজ-সরল, সাদা ছিল না, তার অনেকটাই অন্ধকার আর ক্লেদে ভরা। কিন্তু তা অবিশ্বাস্য, রূপকথার মতোই।

দুই ভিন্ন সময়ের ভিন্ন দেশের এই দুই নায়িকার জীবনদর্শনেও অনেকটাই কী মিল আছে? মেরিলিন মনরোর একটা বিখ্যাত উক্তি হলো: ‘বুড়ো হবার আগেই জীবনটাকে যাপন করতে শুরু করো!’

জীবন উদযাপন নিয়ে প্রায় একই রকমের উক্তি করেছেন পরীমনিও, জীবনকে তুলনা করেছেন আইসক্রিমের সঙ্গে, যা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে হয়। তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা প্রাইভেসি বলতে কিছু ছিল না, সারাক্ষণই তারা ছিলেন ক্যামেরা আর মিডিয়ার পাদপ্রদীপের তলায়। এমনকি মনরোর এক্স-রে রিপোর্ট, মৃত্যুশয্যায় পাওয়া বারবিচুরেট ড্রাগের পাতা, এমনকি মৃতদেহের ময়নাতদন্তের ছবিও সাংবাদিকরা অতি উৎসাহে প্রকাশ করে ফেলেন, যা ছিল এথিকস-বিবর্জিত কর্মকাণ্ড।

প্রচুর বিতর্ক আর স্ক্যান্ডালের জন্ম দিলেও দুজনেরই সৌন্দর্য আর গ্ল্যামারে বিমোহিত হয়েছেন এলিট বুদ্ধিজীবী সমাজ। বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক ডেভিড কনোভার মনরো সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ও হলো একজন ফটোগ্রাফারের আরাধ্য স্বপ্নের মতো’, আর আমাদের কবি নির্মলেন্দু গুণ পরীমনিকে বলেছেন, ‘সৌন্দর্যের সুষম আধার!’

আবার এই এলিট গোষ্ঠী ঘৃণাও কম করেনি তাদের। একবার এক বিখ্যাত সাংবাদিক ইন্টারভিউ নেবার সময় তাচ্ছিল্য করে মনরোকে বলেন, ‘শুনেছি, আপনি নাকি কবিতা পড়েন, কবিতা লেখেনও। নিজেকে কি আপনি বুদ্ধিজীবী বা ইন্টেলেকচুয়াল ভাবেন?’ উত্তরে মনরো বিষণ্ন হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বুদ্ধিজীবী নই, কখনও হতেও চাইনি। তবে আমি বুদ্ধিজীবীদের ভালোবাসি!’

এই ঘটনার উদাহরণ টেনে পরে বিখ্যাত ক্রিটিক মোরিন ডোড নিউ ইয়র্ক টাইমস এ লিখেছিলেন: ‘নারীর বুদ্ধিজীবিতা আর সেক্সুয়ালিজমের মাঝে একটা সংঘাত চিরকালই আছে। যেসব এলিট পুরুষ মেরিলিন মনরোর তীব্র কামোত্তেজক সৌন্দর্যর সামনে নার্ভাস ফিল করতেন, তারাই তার বুদ্ধিজীবিতা নিয়ে সর্বসমক্ষে হাসাহাসি আর মজা করে কোনোমতে নিজেদের রক্ষা করতেন, সুপিরিয়র প্রমাণ করতে চাইতেন নিজেদের!’ পরীমনিকে নিয়ে যত ট্রোল, যত হাসাহাসি, যত অশোভন উক্তির পেছনেও কি তথাকথিত ভদ্রলোকদের এই মানসিকতা কাজ করে? কে জানে, মনোবিদরাই ভালো বলতে পারবেন।

এত কিছুর পরও এক সম্মোহনী শক্তি দিয়ে সমাজের ওপরতলার প্রভাবশালী পুরুষদের পদানত করে রেখেছেন তারা দিনের পর দিন। কবি-নাট্যকার-লেখক আর্থার মিলার, বেসবল সুপারস্টার জো ডিম্যাজিও থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট কেনেডি কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি পর্যন্ত সব বিখ্যাত সফল পুরুষই মনরোর একটুখানি সঙ্গ, একটু প্রশ্রয়ের জন্য উদগ্রীব ছিলেন।

আমাদের পরীমনিও কম নন। তাকে জড়িয়ে এত ভিআইপিদের নাম শোনা যায়, এমনকি তদন্তকারী পুলিশ অফিসারও যে টলে যান তার রূপে, লকডাউন ভেঙে তার গ্রেপ্তারে বা আদালতে জমায়েত হয় হাজার হাজার মানুষ– সেসব কেচ্ছা কাহিনি সত্যি রূপকথার মতোই শোনায়।

কিন্তু সত্যি কি তাদেরকে কেউ আদৌ ভালোবেসেছিল জীবনে? ১৯৫৪ সালে মেরিলিন মনরো ব্যক্তিগত জার্নালে লিখেছিলেন: ‘আমি কোনো ফেরেশতা নই, কোনো শয়তানও নই (আই অ্যাম নট অ্যান এনজেল, আই অ্যাম নট আ ডেভিল), আমি এই মহাবিশ্বে একটা ছোট্ট মেয়ে, যে কারো ভালোবাসার কাঙাল!’

এই আগস্টে, মেরিলিন মনরোর ৫৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নরম্যান রোস্টেনের স্মৃতিকথা পড়তে গিয়ে আচমকাই কাকতালীয়ভাবে পেয়ে যাই এক আশ্চর্য যোগাযোগ। মেরিলিন মনরোর বিষাদমাখা মৃত্যুর অব্যবহিত পর মার্কিন লাইফ ম্যাগাজিন এ প্রকাশিত হয়েছিল আমাদের বাংলাদেশের কবি দিলওয়ারের একটি ইংরেজি কবিতা, যা চমকে দিয়েছিল নরম্যান রোস্টেনকে।

সেই অবধি মার্কিন আর বাংলাদেশি এই দুই কবির এক আমরণ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। পাঠকের জন্য কবিতাটির কয়েক ছত্র তুলে দিতেই হয়, কারণ আজ পরীমনিকে নিয়ে এ রকম একটা কবিতা লেখার মতো কেউ নেই আমাদের মাঝে, কবিতাও আজকাল জনতার রোষকে সমঝে চলে।

ইউ মে কল হার/ অ্যা ব্যাড গার্ল/ অ্যা ম্যাড গার্ল/ অ্যা মরবিড হিউম্যান ফ্রাইট/ বাট আই নো, ও লিসন টু মি/ শি ইজ আ স্যাড গার্ল/ আ রেড গার্ল/ অফ জোডিয়াক্যাল লাভ অ্যান্ড লাইট। (‘আ গ্লান্স অফ এম এম’, দিলওয়ার)।

লেখক: কথাসাহিত্যিক