?????????????????????????????????????????????????????????

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: জমিদারি আমলের কীর্তিতে ভরপুর ময়মনসিংহ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্র‏হ্মপুত্র নদ। এর দুই তীরে রয়েছে সবুজ শ্যামল শোভা। নৌকা নিয়ে ব্রিজের নিচ দিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ায় আছে প্রবল আনন্দ। যেদিকে চোখ যাবে মনে হবে, এ যেন সবুজের আদিগন্ত সাগর।


কয়েকদিন বেড়ানোর মতো পরিবেশ ময়মনসিংহে রয়েছে। অন্যতম আকর্ষণ মহারাজ সূর্যকান্ত্র আচার্যের রাজবাড়ি শশীলজ। কত না ফুলগাছের ছড়াছড়ি এখানে। এই জেলায় আরো রয়েছে- গৌরীপুর রাজবাড়ি, মুক্তগাঘার রাজবাড়ি, দুর্গাবাড়ি, কেল্লাপুর, বোকাইনগর দুর্গ, আলেকাজান্ডা ক্যাসেল, মহারাজ শশীকান্তের বাড়ি, রাজেশ্বরী, বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধি, আটানি জমিদারবাড়ির শিব ও গোয়ালমন্দির (মুক্তগাছা)।


‘হাওড়-জঙ্গল-মোষের শিং, এই তিনে ময়মনসিংহ’। ময়মনসিংহে কখনো সিংহ ছিল না। সুতরাং সিংহ থেকে ময়মনসিংহ নামকরণ হয়নি। একদা এই অঞ্চলে প্রচুর মহিস ছিল। মহিষের ‘শিং’ থেকে যে ময়মনসিংহ হয়েছে একথাও কেউ বলেন না।

এ অঞ্চল একদা ছিল সমুদ্রগর্ভে। খ্রিস্টের জন্মের পরবর্তীকালে গারো পাহাড়ের দক্ষিণবর্তী এলাকা ক্রমে সমুদ্রগর্ভ থেকে ভেসে উঠতে থাকে। অতঃপর ধীরে ধীরে বসতি গড়ে উঠতে লাগল। প্রথমে কামরূপের গারো ও কোচ-গোত্রের অধিবাসীরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করে।

ষোড়শ শতাব্দীতে বঙ্গের স্বাধীন সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তাঁর পুত্র সৈয়দ নাসিরুদ্দিন নসরত শাহকে এখানে পাঠান। সে-সময় এই এলাকার নাম হয় তাঁর নামানুসারে। পরে নসরত শাহীর যুগ কেটে গেলেও ‘নাসিরাবাদ’ নামটি হুবহু থেকে যায়। ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার অনেক পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই জায়গার নাম ছিল ‘নাসিরাবাদ’।

মোঘলদের আমলে মোমেন শাহ ছিলেন এই অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট পীর। সমগ্র অঞ্চলে ছিল তাঁর দারুণ প্রতিপত্তি। তাই সম্রাট আকবর তাকে দলভুক্ত করে নিলেন। পরবর্তীকালে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এই অঞ্চলের নাম হয় ‘মোমেনশাহী’ অতঃপর ‘ময়মনসিংহ’।

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কয়েক ঘণ্টা পরপর ট্রেন ছেড়ে যায় ময়মনসিংহের দিকে। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস যায়। ময়মনসিংহে রাত যাপন করার জন্য কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে।

ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে দেখবেন ব্র‏হ্মপুত্র নদ। এর উপরে রয়েছে সেতু। সেতুর এপার থেকে ওপারে হেঁটে যাওয়ায় আনন্দ রয়েছে। বর্ষায় নবযৌবন ফিরে পায় ব্র‏হ্মপুত্র। দেখবেন নদীতে পালতোলা নৌকা। ইচ্ছে করলে নৌকা ভাড়া করে নদীতে বেড়াতে পারেন। নৌকা নিয়ে অনেক অনেক দূরে বিলাঞ্চলে গিয়ে বাংলার সবুজ শ্যামল রূপ খুঁজে পাবেন।

এখানে জাদুঘরে দেখবেন হিন্দু জমিদারদের অনেক স্মৃতিজড়ানো বিভিন্ন সামগ্রী। আদালতপ্রাঙ্গণ ঘুরে কাছারি মসজিদের কাছে রাস্তার মোড় হয়ে সোজা এগিয়ে যান। এর একটু সামনেই কর্পোরেশন স্ট্রিটের পাশেই দেখবেন ‘শশীলজ’। একদা এখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। সুরম্য ও সুরক্ষিত এই প্রাসাদের পাশ দিয়ে যেতে হত। মাথায় কোনো ছাতা ব্যবহার করা যেত না। কয়েক মিনিট সময় হাতে নিয়ে শশীলজ দেখে নিন। মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য তারই দত্তক পুত্র শশীকান্তের নামানুসারে ময়মনসিংহ শহরে একটি বিলাসবহুল সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করেন। প্রাসাদের নাম রাখা হয় ‘শশীলজ’। সেটি ছিল সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমদিকের কথা। পরবর্তীকালে শশীকান্ত প্যারিস থেকে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সংগীত-সিঁড়ি এনে স্থাপন করেছিলেন এই শশীলজে। এই সিঁড়ি বেয়ে উঠলে একধরনের সুর বেজে উঠত।

শশীলজ দেখার পর ‘গৌরীপুর লজ’ দেখার জন্য ময়মনসিংহ সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার কাছে আসুন। এটিও আকর্ষণীয়।
ব্র‏হ্মপুত্র নদের একপাড়ে শুয়ে আছেন হযরত বুড়া পীর। মাজার জিয়ারত করে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা ঘুরে দেখুন।
আলেকজান্ডার ক্যাসেলটিও দেখার মতো। এটি এককালে বসতবাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হত। ১৯২৬ সালে এখানে আতিথ্য গ্রহণ করে গেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ময়মনসিংহে আরো দেখবেন গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বিলাসভবন। এটি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। দালানকোঠার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার জন্যই এই মনোরম কাঠের বাড়িটি তৈরি হয়েছিল। এটি নির্মাণের মিস্ত্রি ছিল চীনদেশীয়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি দেখে নিন। এটি একসময়ে ‘সূর্যকান্ত হাসপাতাল’ নামে পরিচিত ছিল।

টাউনহলটি বহু স্মৃতি নিয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে। মহারাজ সূর্যকান্ত এটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৯৬ সালে। ‘ছায়াবাণী’ সিনেমাহলটি একদা ‘অমরাবতী নাট্যশালা’ নামে পরিচিত ছিল। ময়মনসিংহের দর্শনীয় প্রাসাদগুলোর মধ্যে এটিও প্রাচীন।

আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মুমুন্নেসা মহিলা কলেজও ঘুরে দেখুন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরে বেড়াবার সময় দেখবেন সবুজ গাছগাছালি। শুনবেন কত-না পাখির ডাক। বিচিত্র প্রজাতির পাখি দেখে দু-নয়ন আনন্দে ভরে উঠবে।


ময়মনসিংহ গিয়ে বারবার মনে পড়বে মুক্তাগাছার কথা। ময়মনসিংহ থেকে মাত্র ৩০ মিনিটে মুক্তাগাছা যওয়া যায়। মুক্তাগাছায় দেখবেন জমিদারবাড়ি, জলসাঘর, কালিমন্দির, শিবমন্দির, দীঘি। এখানের ম-ার খ্যাতি দেশজোড়া। ম-া পাবেন জমিদারবাড়ির ঠিক উল্টোদিকে।

ময়মনসিংহের আশপাশে যেদিকে যাবেন দেখবেন সবুজ ধানক্ষেত, শস্যক্ষেত ও গাছগাছালির শোভা। এমন শোভা আর কোথাও মেলা ভার। তাই ময়মনসিংহ ছেড়ে কিছুতেই ফিরে আসতে মন চাইবে না।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যাওয়ার জন্য রেলপথে ট্রেন রয়েছে। হোটেলের নাম নিরিবিলি, রিভার প্যালেস, ঈশা খাঁ, হোটেল আসাদ, আমির ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল মোস্তাফিজ, উত্তরা, ঋর্ণা হোটেল, শান্তনীড় হোটেল, মমতা রেস্ট হাউস, বর্ণালী, শাকিল গেস্ট হাউস।


অন্যান্য তথ্য : ময়মনসিংহ জেলা নদী-নালা, খাল-বিল, শাপলা-শালুক, পাখপাখালি আর গাছগাছালির ছায়াঘেরা মমতা-মেশানো এক উর্বরা ভূখ-। ময়মনসিংহ জেলাকে নিয়ে প্রচলিত ছড়া রয়েছে : ‘হাওড়-জঙ্গল-মহিষের শিং, এই তিনে ময়মনসিংহ।’ পদ্মা, ব্র‏হ্মপুত্র, মেঘনা বিধৌত পলিসমৃদ্ধ উর্বর মাটির দেশ ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহের পূর্ব নাম ‘নাসিরাবাদ’ ও ‘মোমেনশাহী’। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে পুরাতন ব্র‏হ্মপুত্র, বানার, মহারানী নদী। উপজেলা মোট ১২টি, এগুলো হলÑ ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা, ফুলপুর, হালুয়াঘাট, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া, গফরগাঁও, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল ও ধোবাউড়া। এ জেলার আয়তন প্রায় ৪,৩৬৩ বর্গ কিলোমিটার।

বিদ্রোহী কবির ত্রিশাল
ঢাকার কাছেপিঠেই ত্রিশাল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি জড়িত ত্রিশাল। সকালে গিয়ে সারাদিন ঘুরেফিরে দেখার পর সন্ধ্যার আগেই ঢাকা ফিরে আসুন। এক রাত ত্রিশালে থাকতেও পারেন। ওখানে রাত যাপনের জন্য আবাসিক হোটেলও রয়েছে।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা তেকে সড়কপথে বাস অথবা কোস্টারে ত্রিমালে পৌনে দুই ঘণ্টায় যাওয়া যায়। বাস ছাড়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনাগামী যে-কোনো বাসে কিংবা কোস্টারে উঠে ত্রিশালে নামা যায়।

যা দেখবেন, যা জানবেন : ত্রিশালে নেমে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন। নজরুল তাঁর যৌবনের প্রথমদিকে বহুদিন এখানে নেমে গেছেন। এখানে বটগাছের নিচে বসে নজরুল গান, কবিতা রচনা করেছেন। বটগাছ এটি ত্রিশালের ছিলমপুর গ্রামে অবস্থিত। আজকাল ছিলমপুরকে কেউ ছিলমপুর বলে না, বলে বটতলা। সকুনি বিলের পাড়ে এই বটতলায় বসে নজরুল তাঁর ছোটগল্প ‘অগ্নিগিরি’ লিখেছিলেন। এই গল্পে ময়মনসিংহের অনেক জায়গার নাম আছে।

দরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়টি দেখে নিন। নজরুল এই স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। স্কুলের সেই ঘর এখন আর নেই। দরিরামপুর স্কুল এখন ‘নজরুল একাডেমি’ নামে পরিচিত। নজরুল স্মরণে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ত্রিশাল নজরুল মহাবিদ্যালয়, নজরুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নজরুল পাঠাগার। ঘুরেফিরে এসব দেখে নিন।

বটতলার কাছে সকুনি বিলে যেতে ভুলে যাবেন না কিন্তু। ত্রিশাল থেকে চলে যাওয়ার সময় নজরুল এই ঐতিহাসিক বটতলার কাছে সকুনি বিলে তাঁর কিছু জিনিসপত্র ফেলে রেখে গিয়েছিলেন।

ত্রিশালে নজরুলের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে সগর্বে বলবেন, মহান এই চিরবিদ্রোহীকে বাংলা মা নিজেকে উজাড় করে লালন করেছিলেন ময়মনসিংহের এই ত্রিশালে। এই দাবিতে আজ গর্বিত বাংলা আর গর্বিত বাঙালি জাতি।

ত্রিশালে গিয়ে নজরুলের লেখা ‘শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ‘কারার এই লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুন্তর পারাবার’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ প্রভৃতি গানের কথা আপনার হৃদয়ে বারবার জেগে উঠবে হয়তোবা।
বর্ষার সময়ে এখানের বিলঝিল জলে ভরে ওঠে। তখন নৌকায় সবুজ গাছগাছালির নিচে বেড়াতে গিয়ে দোয়েল-শ্যামার ডাকে বারবার পিছনে ফিরে তাকাবেন। ত্রিশালে গেলে এমনটিই হয়।

বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ চুরুলিয়ায় নজরুলের জন্ম। মাত্র আট বছর বয়সে নজরুলকে পিতৃবিয়োগের দুঃখের যাতনা সইতে হয়। তাই লোকে তাকে দুখু মিয়া বলে ডাকত। রুজি-রোজগারের আশায় আসানসোল শহরে এক রুটির দোকানে কাজের অবসরে কবিতা ও গান লিখে সময় কাটাতেন।

এমনি একটি প্রতিভা রুটি বানানোর কাজে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এটি প্রথমে দেখতে পেলেন দারোগা কাজী রফিজউদ্দিন। আসানসোল থেকে তিনি নজরুলকে নিয়ে এলেন নিজ গ্রামের বাড়ি। ময়মনসিংহ জেলার কাজির সিমলাতে। এখানে কোনো স্কুল না-থাকাতে কাজী রফিজউদ্দিন নজরুলকে ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করে দেন। ১৯১৭ সালে নজরুল এ স্থান ত্যাগ করে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিলেন।

ভালুকা ও হালুয়াঘাট : ময়মনসিংহের দক্ষিণে ভালুকা। এর আশপাশে রয়েছে বনাঞ্চল। ময়মনসিংহের উত্তরে হালুয়াঘাটে গেলে পাহাড় দেখতে পাবেন। ধোবাউড়াও খুব আকর্ষণীয় জায়গা। এ এলাকায় বিলাঞ্চল দেখতে পাবেন। উত্তরে গেলে দেখবেন সীমান্ত এলাকা ও পাহাড় অরণ্য।

মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি : দেশের প্রাচীনতম জমিদারবাড়ির মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা জমিদারবাড়িটি অন্যতম। যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক এই জমিদারবাড়ির ভবন আজ ধ্বংসের পথে। মুক্তাগাছা শহরটির গোড়াপত্তন করেন বগুড়ার শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী। ১৭২৭ সালে তিনি আলেকশাহী পরগনার বন্দোবস্ত লাভ করেন নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে। এর আগে নাম ছিল মুক্তারাম। মুক্তাগাছা জমিদারি প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী বগুড়া থেকে নৌকাযোগে মুক্তাগাছায় আগমন করেন। মুক্তাগাছায় গিয়ে দেখবেন তাঁর জমিদারবাড়ি, বাগানবাড়ি, পুকুর, রিভলভিং স্টেজ, হাতিশালা, মন্দির।