বিশেষ প্রতিনিধি: মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া নদীর প্রান্তশেষে অবস্থিত চাঁদপুর জেলা। ঐতিহাসিক জেএন গুপ্তের মতে, বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায়ের নাম থেকে চাঁদপুরের উৎপত্তি। কেউবা বলেন, দরবেশ চাঁদ ফকিরের নামানুসারে চাঁদপুরের নামকরণ হয়েছে। চাঁদ সওদাগর সপ্তডিঙ্গা মধুকর ভাসিয়ে এ নদীবন্দরে বাণিজ্য করতে আসতেন। তার নামানুসারে এই বন্দরের নামকরণ করা হয় চাঁদপুর একথাও অনেকে বলেন।

মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী বয়ে গেছে এই জেরার উপর দিয়ে। চাঁদপুর জেলা মোট ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এগুলো হলো চাঁদপুর সদর, মতলব, হাইমচর, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, শাহারাস্তি ও ফরিদগঞ্জ। এ জেলার আয়তন প্রায় ১,৭০৪ বর্গকিলোমিটার। চাঁদপুর জেলায় রয়েছে- লোহাগড়া মঠ, নাওড়াই মাঠ, তুলতুলি মঠ (কচুয়া), নাসিরকার্টের দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, বেগম মসজিদ, মতলবের রথ, কাশিমবাজার বারদুয়ারা।

মেঘনাপাড়ের চাঁদপুরকে অনেকে বলেন মেঘনাকন্যা। রুপালি ইলিশের দেশও বলেন কেউ কেউ। বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তে এখানে প্রচুর ইলিশের ছড়াছড়ি। নদীপথে লঞ্চে কিংবা স্টিমারে এখানে বেড়াতে গেলে টাটকা ইলিশ মাছ কিংবা স্টিমারে এখানে বেড়াতে গেলে টাটকা ইলিশ মাছ রান্না ও ভাজা খেতে পারবেন।

ঢাকা থেকে নদীপথে লঞ্চে চাঁদপুর যাবেন। যাওয়ার পথে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, পদ্মা, মেঘনা নদী দেখে চাঁদপুর যাওয়ার এক দারুণ অভিজ্ঞতা। দারুণ রোমাঞ্চ তো বটেই। সকাল ৮টার লঞ্চে উঠলে ৪ ঘণ্টা পরে চাঁদপুর গিয়ে পৌঁছবেন। লঞ্চ ছাড়ে ঢাকার সদরঘাট থেকে। নদীপথে যাওয়ার সময় মেঘনা নদীতে অথৈ পানি দেখে হারিয়ে যাবেন স্বপ্নের রাজ্যে। জেলেরা মেঘনায় মাছ ধরছে এ দৃশ্য দেখে আরো অভিভূত হবেন। মাঝির কণ্ঠে শুনবেন ‘সারা জীবন বাইলাম বৈঠা তবু তোর মনের নাগাল পাইলাম না’ কিংবা ‘মাঝি বাইয়া যাও রে…’ গান। তখন আরো বেশি মুগ্ধ হবেন। এখানে নদীর একূল-ওকূল দেখা যায় না।
সড়কপথে বাসেও চাঁদপুর যাওয়া যায়। সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। সড়কপথে ঢাকা থেকে চাঁদপুরের দূরত্ব ১৬৯ কি.মি.।

চাঁদপুরে যা দেখবেন : এখানে স্টেডিয়াম, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘অঙ্গীকার’, সরকারি কলেজ, লেক, বড় মসজিদ, মাৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, সেচ প্রকল্প, পুরানবাজার ঘুরে দেখুন। সরকারি কলেজ ভবনটি দেখে যথেষ্ট আনন্দ পাবেন। এটি ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি মহিলা কলেজ, ল’ কলেজ, সরকারি বালক বিদ্যালয়, উদয়ন শিশু বিদ্যালয় দেখে বলবেন, শিক্ষাক্ষেত্রে চাঁদপুর অনেক এগিয়ে আছে।

মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত চাঁদপুরের পশ্চিমপাশে দেখবেন লঞ্চ আর নৌযানের ছড়াছড়ি। মেঘনা নদীর তীরে বেড়াতে গিয়ে নদীতে নৌবিহার করতে ইচ্ছে হবে। নদীর দৃশ্য দেখে মনটা আনন্দে ভরে উঠবে।
চাঁদপুর শহরের মাঝ দিয়ে ডাকাতিয়া নদী বয়ে গেছে। এর উপরে রয়েছে ব্রিজ। ব্রিজ পেরিয়ে এপার-ওপার যাওয়া-আসায় আছে ভীষণ আনন্দ। নদীর উত্তরপাড়ে অবস্থিত নতুন বাজার। এখানে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রেলস্টেশন রয়েছে আর দক্ষিণপাড়ে অবস্থিত পুরানবাজার। এখানে গিয়ে দেখবেন শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দোকানপাট।


১৮৬৯ সালে চাঁদপুরে প্রথম পৌরসভা স্থাপিত হয়। লেকের পাশে দেখবেন ফুলগাছের ছড়াছড়ি। ফোয়ারাও চোখে পড়বে। লেকের মাঝখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘অঙ্গীকার’ দেখার মধ্যদিয়ে আপনি একইসঙ্গে আন্দোলিত হবেন, আনন্দ পাবেন। লেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। এখানের বাজারে গেলে দেখবেন তাজা রুপালি ইলিশের ছড়াছড়ি।

ব্রিটিশ আমলে এই চাঁদপুরকে বলা হতো বাংলার সিংহদ্বার। ১৯২০ সালে আসামের চা-বাগানের মালিকদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শ্রমিকরা চলে আসে এখানে এবং এই চাঁদপুরে সবাই সমবেত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। চা-বাগানের কুলিদেরর আন্দোনকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরের নাম সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। কুলিা যখন চাঁদপুর স্টিমারঘাটে সমবেত হয়ে স্লোগান দেয়া শুরু করে তখন ইংরেজ সরকার তাদের গতিরোধ করে। অতঃপর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তখনকার অন্যতম রাজনৈতিক নেতা হরদয়াল নাগ। তাঁর কথা এখনও চাঁদপুরবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন।
চাঁদপুরে যে ক’দিন থাকবেন প্রতিদিনই বারবার জলবতী মেঘনাপাড়ে ছুটে যেতে ইচ্ছে হবে। বারবার মনে হবে ‘স্যান্ড অব ডি’ কবিতার কথা। চাঁদপুর গেলে মেঘনা নদী আপনার হৃদয়ে বারবার দোলা জাগাবে, গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে হবে আপনার- ‘ও নদীরে’। এখানে প্রতিদিন ইলিশমাছের নানান পদ থেকে খেতে স্বাদে-গন্ধে ভরে উঠবে ভোজনরসিকদের মন। চাঁদপুর বেড়ানো আপনার জীবনে হয়ে থাকবে স্মরণীয় ঘটনা।
মতলব : চাঁদপুরের মতলব উপজেলায় গেলে এখানের মেহরানে জগন্নাথ মন্দির দেখবেন। মন্দিতরের অভ্যন্তরের ৭টি বিগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি কাঠের ও একটি পাথরের।
ফরিদগঞ্জ : চাঁদপুর থেকে ফরিদগঞ্জ যাবেন বাসে। নদীপথে লঞ্চে যেতে পারেন। শেখ ফরিদ নামে একজন বিখ্যাত মুসলিম সাধক এই এলাকায় ইসলামধর্ম প্রচার করে বহু মানুষকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারেই এই জায়গার নাম হয় ফরিদগঞ্জ।
এখানের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহাসিক সাহেবগঞ্জের ‘নীলকুঠি’। এটি দেখে অতীত স্মৃতি খুঁজে পাবেন। ইলিয়ট ও জর্জ চার্লস নামে দুজন খ্রিস্টান জমিদার এই এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কয়েকটি বড় বড় রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। এখানে তাঁদের নামে দীঘি ও রাস্তা রয়েছে। এগুলো ঘুরে দেখুন।
ফরিদগঞ্জের চান্দ্রাবাজারে থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে লোহাগড়া গ্রামে গেলে একটি ঐতিহাসিক মঠ দেখতে পাবেন। প্রতাপশালী ছিল যে, এরা যখন যা ইচ্ছা তাই করত এবঙ তা প্রতিফলিত করে আনন্দ অনুভব করত। এই দুই ভাইয়ের নামানুসারে গ্রামের নাম রাখা হয় ‘লোহাগড়া’। ডাকাতিয়া নদীতীরের ঐতিহ্যবাহী মঠটি দেখে নিন। একই সুযোগে দেখুন দুই ভাইয়ের প্রাসাদ।
রূপসা গ্রামে দেখবেন জমিদারবাড়ি। জমিদারবাড়ি দেখার পরে লাউতলীর দীঘি, আহম্মদিয়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, আহম্মদীয়া মাদ্রাসা ভবন ঘুরে দেখুন। পড়ন্ত বিকেলে ডাকাতিয়া নদীতে নৌবিহার করুন। মাঝে মাঝে চরও দেখবেন, চরে নেমে বেড়াতে পারেন। দেখবেন কত বিচিত্র প্রজাতির পাকি এখানে দুপায়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। এখানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হারিয়ে যাবেন স্বপ্নে রাজ্যে।
চাঁদপুরের উল্লেখযোগ্য কীর্তির মধ্যে রয়েছে শাহরাস্তি সাহেবেরর মাজার ও মসজিদ। ফালচোঁ ইউনিয়নের ফিরোজ শাহ লশকরের দীঘি ও মসজিদ দেখে অভিভূত হবেন। শাহরাস্তি, হাজিগঞ্জই এই জায়গায় স্থাপত্যীর্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখেও মুগ্ধ হবেন।
যেখানে থাকবেন : চাঁদপুর শহরে রাত্রি যাপন করার জন্য বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেমন- হোটেল রজনীগন্ধা (কুমিল্লা রোড, বাটা শো-রুশের বিপরীতে); হোটেল তাজমহল (চৌধুরীঘাট); হোটেল শ্যামলী (চৌধুরীঘাট, কুমিল্লা রোড); গাজী আবাসিক বোর্ডিং (হাজী মোহসীন রোড)।
অন্যান্য তথ্য : ঢাকা থেকে নদীপথে চাঁদপুরের দূরত্ব ৬৯ কি.মি.। লঞ্চ, স্টিমার চাঁদপুর হয়ে বরিশাল, কাউখালী, হুলারহাট, চরখালী, মোংলা হয়ে খুলনা পর্যন্ত রায়। ঢাকার সদরঘাট থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত সরাসরি যে লঞ্চ যায় তা হলো-লিলি, ময়ূর, সোনার তরী, মিতালী, বোগদাদীয়া-৫, ঈগল-১, ঈগল-২।