বিশেষ প্রতিনিধি: ঘুরতে কার না মন চায়। কিন্তু ২০২০ সাল করোনাভাইরাস নামক মরণঘাতি ভাইরাস দেশ-বিদেশসহ সারা পৃথিবীকে উলট পালট করে দিয়ে মানুষের জীবনকে করেছে অশ্রুসিক্ত। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে লাখ লাখ। ধমকে দাঁড়িয়েছে মানুষের জীবন। লকডাউনের তিক্ততা ভুলে আর এক ঘেয়েমি জীবন দুর করতে একটু ভ্রমনে মনে আনবে প্রফুল্লতা।

মুন্সিগঞ্জ জেলার চারদিকে নদী-বেষ্টিত। এই জেলার দক্ষিণে পদ্মা নদী, পূর্বে মেঘনা নদী এবং উত্তরে ধরেশ্বরী নদী বয়ে গেছে।

মুন্সিগঞ্জ জেলার নামকরণ স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে : ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইদ্রাকপুর কেল্লার ফৌজদারের নামানুসারে মুন্সিীগঞ্জের নাম ছিল ইদ্রাকপুর। চিরস্তায়ী বন্দোবস্তের সময় রামপালের কাজী কসবা গ্রামের মুন্সি এনায়েত আলী সাহেবের জমিদারিভুক্ত হওয়ার পর ইদ্রাকপুর মুন্সিগঞ্জ নামে পরিচিত থেকে শুরু করে।


ধলেশ্বরী, পদ্মা, মেঘনা নদী বয়ে গেছে মুন্সিগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে। ৬টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলা। উপজেলাগুলো হলো- মুন্সিগঞ্জ সদর, টঙ্গীবাড়ি, শ্রীনগর, লৌহজং, গজারিয়া এবং সিরাজদিখান। এই জেলার আয়তন প্রায় ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার।
নদীবিধৌত মুন্সিগঞ্জের উর্বর মাটিতে অসংখ্য কৃতী সন্তানের জন্ম হয়েছে। এঁরা হলেন- বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, অতীশ দীপঙ্কর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গণিতবিশারদ অধ্যাপক রাজকুমার সেন, লেখক ও ভাষাবিদ হুয়ায়ুন আজাদ, ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু, মুখোপাধ্যায়, বাংলার সিংহপুরুষ চাঁদ প্রমুখ।


নদীবিধৌত মুন্সিগঞ্জে নৌভ্রমণে দারুণ মজা রয়েছে। এখানের উল্লেখযোগ্য জায়গা হলো- ভাগ্যকূল, মেদিনী মন্ডল, দীঘিরপাড়, চরমিলই, ব্রজযোগিনী, রামপাল, শিমুলিয়া। এই জেলায় রয়েছে কাঠের ভিটা, বাবা আদমের মসজিদ, হরিশ্চন্দ্র রাজার দীঘি, রাজা বল্লালম সেনের বড়ি, ভাগ্যকূল রাজবাড়ি, ঘোলঘর মঠ, রজা শ্রীনাথের বাড়ি, রামলাল দীঘি, পাঁচ পরীরের দরগাহ, তাজপুর মসজিদ, জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়ি, পাথরঘাটা মসজিদ।


যা জানবেন যা দেখবেন : চন্দ্রসেন পালদের আমলে বাংলার রাজধানী ছিল রামপালে। এরই সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ। এখানে রয়েছে ইদ্রাকপুর দুর্গ, বাবা আদমের মসজিদ, কাজী কসবার মসজিদ, মীর কাদিম সেতু ইত্যাদি। মুন্সিগঞ্জ আর রামপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়নাভিরাম। সর্বত্রই যেন সবুজে ঢাকা। ঘণ্টা পাঁচেক সময়ের মধ্যে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম যুগের কীর্তিগুলো দেখে নিতে পারবেন।
কাজী কসবা গ্রামে গেলে একটি প্রাচীন মসিজদ দেখবেন। এর নাম কাজী বসবার মসজিদ। এটি পনেরো শতকে নির্মিত হয়েছিল।
মুন্সিগঞ্জ বেড়াতে গিয়ে বারবার শুনবেন ‘বিক্রমপুর’ নামটি। একদা এক বিরাট এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল বিক্রমপুর। সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নাম থেকে বিক্রমপুর নাম হয়েছিলে বলে অনেকে মনে করেন। আবার কেউ বলেন, দ্বিতীয় পার রাজা ধর্মপালের উপাধি ছিল বিক্রমাদিত্য এবং তা থেকেই এ স্থানের নাম হয় বিক্রমপুর।


বিক্রমপুর একটি সুপরিচিত ঐতিহ্যম-িত এলাকা। এখনও অনেকে বিক্রমপুরকে নিয়ে গর্ব করেন। বিক্রমপুরের প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত স্থানসমূহের মধ্যে বাবা আদম মসজিদ, অতীশ দীপাকরের স্মৃতিস্তম্ভ, ইদ্রাকপুর দুর্গ, মীর কাদিম সেতু, হরিশ্চন্দ্রের দীঘি, সোনার মন্দির, পাটপাড়া সতীদাহ মন্দির, রিকাবী বাজারের মসজিদ, বল্লাল সেনের দীঘি, কোদালধোয়া দীঘি উল্লেখযোগ্য।
‘অতীশ দীপংকর’ নামটি মুন্সিগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে। অতীশ দীপংকর ব্রজযোগিনী গ্রামে ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। এই প-িতের জন্মভূমি ব্রজযোগিনী গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। অতীশ দীপংকর তখনকার বরেন্দ্রভূমি যা পুন্ড্রবর্ধনের আদি বাসিন্দা পালবংশীয় রাজা মহীপালের আমন্ত্রণে সেকালের বিশ্বখ্যাত বিক্রমশীলা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাচার্য বা অধ্যাপকের অত্যন্ত সম্মানজনক পদটি গ্রহণ করেন। তাঁর অধ্যয়নকালে বিক্রমশীলা মহাবিহারে তুর্কিস্থান, আফগানিস্তান, চীন, কাশ্মীর প্রভৃতি দেশের ৮ হাজার ছাত্র তাঁর তত্ত্বাবধানে অধ্যয়নরত ছিলেন। মহাজ্ঞানী অতীশ দীপংকর রচনা করেছেন শতাধিক মূল্যবান গ্রন্থ। মঙ্গোলিয়াসহ উত্তর এশিয়ার দেশে দেশে অতীশ দীপংকরকে ‘দ্বিতীয় যুদ্ধ’ বলে গণ্য করা হয়। ব্রজযোগিনী গ্রামের পন্ডিতের ভিটা নামক স্থানটি আজও বহন করে চলেছে অতীশ দীপংকরের জন্মভূমি।


রাজা হরিশ্চন্দ্রের দীঘি ছাড়াও বিক্রমপুরে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক দীর্ঘি। এগুলোর মধ্যে রামায়ণ দীঘি, রামদহ দীঘি, সুখবাসুদেব দীঘি, মঘাদীঘি, টঙ্গীবাড়ি দীঘি, ভগবান রায়ের দীঘি, শানের দীঘি, বিশ্বেশ্বর দীঘি, সাগর দীঘি অন্যতম। বিক্রমপুরে আরও রয়েছে সুখবাসর বাগানবাড়ি, পাঠশাহীর পোড়া মঠ, পাকাম পুল, কমলাঘাটের পরিত্যক্ত লোহার পুল, গোশাল নগরে পালের বাড়ি প্রভৃতি।


বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে নদীয়া থেকে পালিয়ে এসে লক্ষ্মণ সেন ও তার সন্তানেরা কিছুকাল এখান থেকে রাজস্ব করেছিলেন।
বর্মণদের রাজধানী ছিল এই বিক্রমপুর। পালদের প্রাদেশিক রাজধানীও ছিল এই বিক্রমপুরে।
ব্রজযোগিনী গ্রামে যেতে ভুলে যাবেন না কিন্তু। এখানে দেখবেন অতীশ দীপংকরের বাড়ির ধবংসাবশেষ। কতগুলো পোড়ামাটির ইট ছাড়া কিছুই চোখে পড়বে না। অতীশ দীপংকর পরবর্তীকালে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে তিব্বতে চলে যান।
রামপালে দেখবেন রাজবাড়ি ও মন্দির। এসব স্থাপত্য তিব্বতী কিংবা ধ্রুপদী ভারতীয় ধাঁচে তৈরি। দেখে দেখে চন্দ্র কিংবা পালদের যুগে ফিরে যাবেন।


মুন্সিগঞ্জের যেদিকে যাবেন সেদিকেই দেখবেন সবুজ শ্যামল শোভা। বল্লাল সেনের বাড়িটির নকশা প্রথম দর্শনেই ভালো লাগবে। বৌদ্ধ স্থাপত্যও চোখে পড়বে। রাজা হরিশ্চন্দ্রের দীঘিটি কিন্তু রহস্যাবৃত। মাঘী পূর্ণিমার রাতে অলৌকিকভাবে এটি পানিতে ভরে যায়, অথচ সারা বছরই এটি শুকনো থাকে। মাঘী পূর্ণিমার সময়ে এখানে মেলা বসে। তখন পুণ্যার্থী আর সাধারণ পর্যটকদের কাছে গোটা এলাকা হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। এক সময় এক সময় গৌতমবুদ্ধ পদার্পণ করেছিলেন এখানে।
হাজার হাজার সাগরকলার গাছ চোখে পড়বে রামপালে। ধলেশ্বরী নদীতে তাকালে দেখবেন জেলেরা মাছ ধরছে। সে দৃশ্যে আরো বেশি মোহিত হয়ে পড়বেন। প্রকৃতির আদরের দুলালী শস্য শ্যামলা মুন্সিগঞ্জ ছেড়ে কিছুতেই ফিরে আসতে মন চাইবে না।


ইদ্রাকপুরের দুর্গ : মুন্সিগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইদ্রাকপুর দুর্গ। এটি মোঘল আমলের মুসলিম ঐহিত্যের একটি নিদর্শন। এক সময় এখানে আফগান, মগ ও আরাকানীদের আনাগোন ছিল। তাদের প্রতিহত করার জন্য ১৬৬০ সালে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বাংলার সুবেদার মীরজুমলা এই দুর্গ নির্মাণ করেন। দুর্গটির চারদিক মজবুত প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। এখানে একটি সুড়ঙ্গপথ ছিল। এই সুড়ঙ্গপথের সঙ্গে লালবাগের কেল্লা ও সোনাকান্দার দুর্গের যোগাযোগ ছিল। ইছামতি নদী এই দুর্গের পাশ দিয়ে বয়ে যেত। এখন সে নদীর চি‎হ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইদ্রাকপুর দুর্গ থেকে প্রায় ৪ মাইল পশ্চিমে বাবা আদমের মসজিদ ও মাজার। ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ তৈরি করা হয়। কেউ কেউ বলেন, বাবা আদম শহীদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। মাজারটি এর পাশেই। লোকে বলে এটি বাবা আদম শহীদের কবর।


মুন্সিগঞ্জ যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার জন্য সড়কপথে পরিবহন রয়েছে। এগুলো ছাড়ে গুলিস্তানও ডিআইটি থেকে। সময় লাগে দেড়ঘণ্টা। নদীপথে গেলে আরে বেশি আনন্দ। এ জন্য ঢাকা থেকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে এরপরে টার্মিনাল থেকে লঞ্চে মুন্সিগঞ্জ যাবেন। এ রকম ভ্রমণে একটু বৈচিত্র্য খুঁজে পাবেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে মুন্সিগঞ্জের দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার। ঢাকার সদরঘাট থেকেও লঞ্চে মুন্সিগঞ্জ যাওয়া যায়।