তিমির চক্রবর্ত্তী: করােনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীতে সারা বিশ্বকে উলট পালট করে দিয়ে মহা প্রলয় সৃষ্টি করে দিয়েছে মানুষের জীবনকে। যেন সৃষ্টিকর্তা ষ্টীম রোলার চালিয়ে লাশের পৃথিবী উপহার দিয়েছে।

এই মরণ ভাইরাসের কারণে মানুষ হয়েছে কর্মহীন। অর্থনীতির চাকা হয়েছে স্থবির, বিশ্ব বানিজ্য রয়েছে থেমে। যা বিশ্ব আর কোন দিন কখনই দেখেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বল্পন্নত দেশগুলো। যাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। বাংলাদেশ এর মধ্যে একটি।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানের হিসাব অনুযায়ি করোনায় বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষের আয় কমে গেছে৷ আর পরিবার হিসেবে আয় কমেছে শতকরা প্রায় ৭৪ ভাগ পরিবারের। শহরে যারা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েয়েছ। আর এদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ গ্রামে ফিরে গেছে।

গ্রামে ফিরে যাওয়াদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ মানুষ আর কথনোই শহরে ফিরে আসবে না। আমার মতে সবচেয়ে বড় কথা, যারা গ্রামে ফিরে গেছে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কর্মসংস্থান গ্রামেই করা উচিত। এতে করে যেমন ঢাকা শহরের উপর চাপ কমবে অন্যদিকে শহরে আসার প্রবণতাও কমে যাবে। আর অর্থনীতির চাকাও ঠিক থাকবে।

আর এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কুটি শিল্প, মৎস্য চাষ, পশু খামার, পোল্টি ফার্ম, কৃষি চাষ ( সবজি, বিভিন্ন ফল, মসলা) ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকার বেকার যুবকদের লোন দিয়ে সহায়তা করতে পারে। অথবা, ব্যক্তির জমিগুলো সরকার লিজ নিয়ে তাদেরই ঐ সকল শিল্প রক্ষনা বেক্ষণের জন্য চাকরী দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার দুই দিকেই লাভবান হবে । যেমন অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি করা, অপরদিকে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান।

বেকার যুবকরা কৃষকের কাছ থেকে প্রকৃত মূল্যে ফসল কিনে সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ এবং সরবরাহের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে।

অপরদিকে, সরকার তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে উপযুক্ত কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে গ্রামেই ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসস্থানের ভিত স্থাপন হবে।

গ্রামে-গঞ্জে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা, কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটিয়ে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা নিজ উদ্যোগে কিংবা সরকার থেকে লোন নিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। সরকারকে এ ব্যাপারে সহজ শর্তে ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ঘরে বসেই এসব শিক্ষিত লোকজন আইওটির মাধ্যমে ইন্টারনেটের সব ধরণের ব্যবসা এবং আউটসোর্সিং করে বিদেশ থেকে কাজের অর্ডার এনে আয় করতে পারবে বিপুলসংখ্যক বৈদেশিক মুদ্রা।

সরকার ইতোমধ্যে প্রি-প্রাইমারি স্কুলের সূচনা করেছে। অর্থাৎ ঘরের তিন-চার বছরের ছোট্ট শিশুদের প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার আগে দুই বছর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। এখনো সারা বাংলাদেশে এটি কার্যকর হয়নি তবে প্রক্রিয়াটি চলমান। গ্রামে ফিরে যাওয়া শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

বেসরকারি সংস্থা বিআইজিডি ও পিপিআরসির জরিপ বলছে, করোনাকালে রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে ১৫.৬৪ শতাংশ মানুষ। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ, সন্তানের শিক্ষা খরচ এবং যোগাযোগ খরচ সামলাতে না পেরে তাঁরা ঢাকা ছেড়ে নিজ এলাকায় চলে গেছেন। শুধু ঢাকা নয়, বন্দরনগরী চট্টগ্রামেরও একই চিত্র। করোনাকালে কাজ হারিয়ে চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র চলে গেছে ৯ শতাংশ মানুষ।

আর করোনাকালে সবচেয়ে বেশি কাজ হারিয়েছে গৃহকর্মীরা। তথ্য মতে, দেশে এখন ৬ লাখের মতো গৃহকর্মী রয়েছে। করোনাকালে ৫৪ শতাংশ গৃহকর্মী কাজ হারিয়েছে। এরপরই আছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এই পেশায় ৩৫ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে আছে অদক্ষ শ্রমিক। তাদের কাজ হারানোর হার ৩১ শতাংশ।

বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, করোনাকালে আয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রিকশাচালকদের। করোনার আগে একজন রিকশাচালকের দিনে যদি ১০০ টাকা আয় হতো, এখন সেটা কমে ৪৬ টাকায় নেমে এসেছে। আয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর। তাদের আয় কমেছে অর্ধেক। এরপর আছে পরিবহন শ্রমিকরা।

অপরদিকে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ২১.৭ শতাংশ মানুষ। যার সংখ্যা ৩ কোটি ৫৬ লাখ। সংক্রমণের আগে এই ৩ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করছিল। করোনার পর এসব মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

অন্যদিকে করোনার আগেই দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে এখন দারিদ্র্যের হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে যে নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছিল তাও সঠিকভাবে বন্টন হয়নি।মাত্র ১৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ নগদ সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে গ্রামের হার সবচেয়ে কম,মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ। শহরের ৪৭ শতাংশ বলেছে, লকডাউন তুলে দেয়া ছাড়া সরকারের হাতে কিছু করার ছিল না। আর গ্রামের ৩৭ শতাংশ লকডাউন তুলে দেয়ার বিষয়ে এ মত জানিয়েছে।

জরিপের তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসে শহরের দারিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে ৪৩ শতাংশ। গ্রামের মানুষের আয় কমেছে ৪১ শতাংশ। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় কমেছে ২৫ শতাংশ।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার প্রভাবে দেশের বিরাট একটি জনগোষ্ঠী হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক কাজ হারিয়েছে সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস’র দাবি, করোনা সংকটে দেশে সোয়া ৩ লাখ পোশাক শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। এসময়ে প্রায় ১ হাজার ৯১৫টি কারখানা বন্ধ ও লে-অফ হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে, সবগুলো কারখানাই রপ্তানিমুখী নয় বলেও জানানো হয়। বিলসের দাবি, প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ার কারণে এ খাতে কর্মরত ৬০ শতাংশ শ্রমিকের চাকুরি হারানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর এই ভয়ংকর করোনা মহামারী সহসা যাচ্ছে না বলেই মনে করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আসছে শীত মৌসুমে এর ভয়াবহতা আরো বড়তে পারে এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

তাই সামনে দেশে আরো বেশী সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়বে এবং দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠিকে সামাল দেয়া সরকারের পক্ষে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাই, এখন থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বেকারদের গ্রামে কর্মসংস্থানের পদক্ষেপ নিতে হবে। আর গ্রামে ঘনবসতি কম এবং খোলামেলা পরিবেশের কারণেও ভাইরাস কম ছড়াবে। সাথে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে।তাহলেই কেবল এই দানব মহামারীকে মোকাবিলা করা সম্ভব। আর দেশের অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে।