তিমির চক্রবর্ত্তী: কিংবদন্তী গীতিকার, লেখক, সুরকার শাহ আবদুল করিম দেশীয় ঐতিহ্য সৃষ্টিতে অনবদ্য স্বাক্ষর রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সর্বদাই তার গানে আমরা মাটি, মানুষের গন্ধ পাই। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আভার মতো অমিয় বাণী আর সুরের শৈল্পিকতায় এ দেশের বাউলসংগীতের ভাবজগতে সম্রাটের আসনে উন্নীত হয়েছিলেন বাউল শাহ আবদুল করিম। প্রায় শত বছর বয়সী গীতিকার শাহ আবদুল করিম বয়সের ভারে হার মানতে বাধ্য হন আজকের এই দিনে। ছোটবেলায় অত্যন্ত দারিদ্র্যতার মধ্যে তিনি বড় হলেও একতারাকে সাথী করে অসাধারণ কণ্ঠ আর নিজস্ব অনুভূতির সমন্বয়ে গানের ভুবনে নিজেকে ভাসিয়ে দেন। বাউল সম্রাট গুরুতর অসুস্থ হয়ে লন্ডনের রয়্যাল হাসপাতালে দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হলেও দ্বিতীয়বারের মতো সিলেটের একটি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

প্রখ্যাত বাউল সম্রাট আবদুল করিম ১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের দুরাইন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শত বাধা-বিপত্তি, দারিদ্র্রতা তাকে গান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে তিনি গান সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। একটা সময়ে নিজের প্রতিভা আরও শাণিত করার জন্য কামাল উদ্দিন, সাদেক রশীদ উদ্দীন প্রমুখ গুণীজণের নিকট থেকে শাহ আবদুল করিম বাউল গানের উপর ভাটিয়ালী, মুর্শীদি, মারফতী, নবৌত, বিলাইত-এর মতো ভিন্নধর্মী গান রপ্ত করেন। ১৫০০ গানের লেখক ও সুরকার তিনি। ইংল্যান্ডে তিনি দুইবার পারফরমেন্স করেছেন। তাঁর জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য গানÑ গাড়ি চলে না, বন্ধে মায়া লাগাইছে, কৃষ্ণ প্রভৃতি। বর্তমানে হাবিব, দলছুট, কেয়াসহ অসংখ্যা ব্যান্ড দল তাঁর গানগুলোক রিমেক্স আকারে নতুনরূপে পরিবেশন করছে। যা দর্শকের কাছে নতুন চমক সৃষ্টি করেছে।

গানের মধ্যে প্রাণের সন্ধান পাওয়া শাহ্ আবদুল করিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকসহ (২০০১) পেয়েছেন কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক (২০০০), রাগীব-রাবেযা সাহিত্য পুরস্কার (২০০০), লেবাক অ্যাওয়ার্ড, (২০০৩), মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার (২০০৪), সিটিসেল-চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস (২০০৫), বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬), খান বাহাদুর এহিয়া পদক (২০০৮), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা (২০০৮), হাতিল অ্যাওয়াডর্স (২০০৯), এনসিসি ব্যাংক এনএ সম্মাননা ইত্যাদি।

তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিদেশে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি সম্ভারকে পাঠক ও অনুরাগীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তাঁর গানের রচনা, সমগ্র, সব গানের পুনঃপ্রকাশ, মূল্যায়ন ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ চলছে। তাছাড়া শাহ আবদুল করিমের সৃষ্টিকর্ম ছড়িয়ে দিতে ইতোমধ্যে তাঁর বেশ কিছু গান ইংরেজি ও মনিপুরী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ এই জনপ্রিয় গানটির রচনাকারী তিনি নিজেই। তাঁর অসংখ্য গান অন্য শিল্পীরা গেয়ে থাকেন। একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে জীবনের সব পাওয়াতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। একমাত্র ছেলে মাহ নূরজালাল। তাঁর প্রিয় নাতি শাহ নূর আলম ঝলক। তিনি চান নাতি ঝলক একজন বাউল শিল্পী হিসেবে ভবিষ্যতে তাঁর ঐতিহ্যকে ধরে রাখবে। ‘শাহ আবদুল করিম সঙ্গীতালয়’ নামে তাঁর একটি সঙ্গীত একাডেমী আছে। গানের মানুষ শাহ আবদুল করিম। গান করেই মানুসের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। জীবনের যা কিছু অর্জন তাতেই তিনি খুশি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর গানগুলো সঠিক নিয়মে অন্য শিল্পীরা গাইলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে।

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পুণ্যভূমি সিলেটের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর এক দিন আগে থেকেই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ দেশের বাউলসংগীত অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে।